দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বিভিন্ন সংস্থাকে একই বৃত্তে এনে আগামী ত্রিশ বছরের দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনায় রাজধানীকে বদলে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনগণ যদি আমাকে ভোট দিয়ে মেয়র নির্বাচিত করেন তাহলে প্রথম ৯০ দিনের মধ্যেই মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো নগরবাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেব। পাশাপাশি এ সময়ের মধ্যে সেখানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের বিষয়গুলো বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। আর এজন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের যে অভাবকে দায়ী করা হয়, তা দূর করা হবে।
যখন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করব তখন মহানগরীর অন্তর্ভুক্ত সব সংস্থার চাহিদা পত্র নিয়ে সব ধরনের সমন্বয়ের মাধ্যমেই করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ভিশন-২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশের উন্নত রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে প্রদর্শন করতে করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়রের সততা, সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা অত্যন্ত প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়, জানিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত এই তরুণ নেতা।
সম্প্রতি দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে মেয়র হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি টানা তিনবার ঢাকা ১০ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি।
দেশ প্রতিক্ষণ: আপনি তিন বারের সংসদ সদস্য। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হতে চান এবং মেয়র হলে কি কি বিশেষ কাজ করবেন?
শেখ ফজলে নূর তাপস: স্বাধীনতার অনেক বছর পরও ঢাকা সিটি করপোরেশেন থেকে যে ধরনের নাগরিক সুবিধা পাওয়ার কথা সে ধরনের সুযোগ-সুবিধা নগরবাসী এখনো পাচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছেন, সেই উন্নত বাংলাদেশের উন্নত রাজধানী বিনির্মাণ করা আবশ্যক। মৌলিক নাগরিক সুবিধা তারা পাচ্ছে না।
বিষয়গুলো আমাকে হতাশ করেছে, পীড়া দিয়েছে। সেই ভাবনা থেকে আমি আরো একটু বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার চিন্তা করলাম। প্রথমত মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে ঐহিত্যবাহী ঢাকার স্বকীয়তা ও স্বমহিমায় যে সৌন্দর্য ছিল, সেটিকে আবারো পুনরুদ্ধার করে প্রস্ফুটিত করা। চিন্তা করলে মনে হবে অনেক কঠিন কাজ। কাজ কঠিনও। তবে আমি বিশ্বাস করি- আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করলে এটা সম্ভব। সেই নজির আমাদের প্রয়াত মেয়র আনিসুক হক সাহেব দেখিয়েছেন। চাইলে অল্প সময়ে মধ্যে পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমি মনে করি সকলের সমর্থন পেলে আমিও সেটি করতে সক্ষম হব।
দেশ প্রতিক্ষণ: দীর্ঘদিন ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নগরের কোন বিষয়গুলো আপনাকে খুব ভাবিয়েছে? মনে হয়েছে যে, এখানে পরিবর্তন দরকার?
শেখ ফজলে নূর তাপস: রাজধানীর জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জায়গাগুলোয় আমাদের দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেখানে প্রত্যাশা বা পরিকল্পনার সাথে বাস্তবতার অনেক ফারাক রয়েছে। যেমন, খোলা জায়গায় এখনো ময়লা-আবর্জনা স্তুপ করে রাখা হয়, এখনো জলাবদ্ধতার অনেক সমস্যা রয়েছে। গত বছর ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করেছে। বিষয়গুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। এগুলো থেকে জনগণকে অবশ্যই নিস্তার দিতে হবে।
দেশ প্রতিক্ষণ: জরিপে বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য নগরীর তালিকায় উপরের দিকে দেখা গেছে। এই শহরের দুষণও আঁতকে ওঠার মতো। সম্প্রতি বায়ু দূষণের শহর হিসেবে শীর্ষ ওঠার রেকর্ডও আছে। সেই বিবেচনায় কখনো কখনো রাজধানী অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি উঠেছেও। ঢাকাকে বাঁচাতে রাজধানী অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু অনুভব করেন?
শেখ ফজলে নূর তাপস: এটা আসলে জাতীয় পরিকল্পনার চিন্তা। এই পর্যায়ে এখনো চিন্তা করছি না।
দেশ প্রতিক্ষণ: নগরবাসীর কাছে সবচেয়ে দৃষ্টিকটু বিষয়টি হচ্ছে বারবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। একই জায়গায় একাধিকবার খোঁড়াখুঁড়িতে বিরক্ত তারা। এতে উন্নয়নের সুফল যেমন জনগণ পায় না, তেমনি নাগরিক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় নেই কেন-সেই প্রশ্ন নগরবাসীর। বিষয়টিকে কীভাবে দেখতে চান এবং আপনার পরিকল্পনা কী?
শেখ ফজলে নূর তাপস: সিটি করপোরেশনের যে আইনটা আছে, সেখানে কিন্তু সিটি করপোরেশনেরই প্রধান্য। সিটি করপোরেশনের আইন অনুযায়ী অন্য সংস্থাকে সমন্বয় করার বিষয় রয়েছে। সুতরাং অন্যান্য সংস্থাকে সিটি করপোরেশনের আইন মেনেই কাজ করতে হবে। আমরা এখানে ব্যাপক ব্যত্যয় দেখে এসেছি। এই ব্যত্যয়গুলো আর কোনোভাবেই গ্রহণ করা হবে না।
আমাদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকবে। সেই কর্মপরিকল্পনা ও নীতিমালা অনুযায়ী একদম সুষ্ঠু সময়ে কাজগুলো সম্পাদন করতে হবে। আমি চাইব ২০৪১ সালকে সামনে রেখে ত্রিশ বছরের দীর্ঘমেয়াদী একটা মহাপরিকল্পনা করতে। আমরা যে রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণ করব, এগুলো অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদী হবে।
অন্ততপক্ষে এটার স্থায়িত্ব দশ বছর থাকতে হবে। কাজ শুর করার আগে অন্যান্য সংস্থা থেকে আমরা চাহিদা নেব যে, তাদের এখানে কোনো পরিকল্পনা আছে কি না? যদি পরিকল্পনা থাকে তাহলে কখন, কোন মেয়াদে তারা বাস্তাবায়ন করবে, এটা সুনির্দিষ্ট করার পরে আমরা আমাদের কাজ আরম্ভ করব। আমরা কাজ করার পরে অন্তত পক্ষে তিন বছরের মধ্যে ওই সংস্থাগুলো আর কাজ করতে পারবে না। কারণ, একটি রাস্তা করার পরে যদি জনগণ সেই রাস্তাটি ব্যবহার না করতে পারে এবং পরবর্তীতে ছয় মাস পরেই যদি রাস্তা নষ্ট করা হয়, সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। এটা করতে দেওয়া হবে না।
সুতরাং অবশ্যই এখানে সমন্বয় করতে হবে। সিটি করপোরেশনেই এখানে মূল সংস্থা। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে অন্যান্য সংস্থাকে সমন্বয় করতে হবে। সিটি করপোরেশনের যে কার্যপরিধি সেখানে যথেষ্ঠ ক্ষমতা ও কার্যবলী দেওয়া আছে। সেগুলো যদি সম্পূর্ণরূপে ও পরিপূর্ণভাবে পালন করা যায়, তাহলে সিটি গভর্নমেন্ট প্রয়োজন হয় না। এখানে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া আছে। আমার চেষ্টা থাকবে এগুলো দ্রুত গতিতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এবং সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিমুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা। সেটি যদি করা যায় আমার মনে হয় জনগণের প্রতাশা পূরণ হবে।
দেশ প্রতিক্ষণ: রাজধানীর যানজট এখন বড় সমস্যাগুলোর একটি। এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে?
শেখ ফজলে নূর তাপস: যানজট আমাদের জন্য অনেক বড় একটি সমস্যা। মেট্রো রেল শেষ হতে অনেকদিন সময় লাগবে। বর্তমানে যানজটের যে অবস্থা, সেটি অসহনীয় অবস্থায় রয়েছে। সেখানে খুব দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়াত মেয়র আনিসুক হক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আমি চেষ্টা করব তার মডেলগুলো অনুসরণ করার। সেটাকে যদি আরো একটু সংষ্কার করতে হয়….অর্থাৎ দ্রুত সমাধান করা যায়।
আমরা চাইবো তিন মাসের মধ্যে মহাপরিকল্পনা করতে। পরবর্তী তিনমাসের মধ্যে অ্যাকশন প্লান বা ওয়ার্ক প্লান করে সেগুলো কীভাবে রূপান্তর করার পদক্ষেপগুলো নেওয়া যায়। আশা করব এক বছরের মধ্যে যাতে আমরা একটা পরিবর্তনের দিকে যেতে পারি। অন্ততপক্ষে মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করতে পারি। এরপর বাকি পরিকল্পনার আওতায় বিষয়টি আরো তুলে ধরা।
দেশ প্রতিক্ষণ: আপনি মেয়র হলে ঢাকা শহরকে কি ভাবে সাজাতে চান?
শেখ ফজলে নূর তাপস: একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের প্রত্যাশা এবং আকাঙ্খা পূরণের জায়গাগুলোতে প্রাথমিকভাবে কাজ করতে চাই। এতো সুন্দর শহর…পাশে দুটি নদী। একটি বুড়িগঙ্গা, আরেকটি শীতলক্ষ্যা নদী। পুরান ঢাকা কিন্তু এই দুটি নদীর অববাহিকায়। বহির্বিশ্বে যখন আমরা যাই, দেখি একটি নদী থাকলেই তারা কী সুন্দরভাবে কাজে লাগায়। অথচ আমাদের দুটি নদী থাকার পরও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি।
এখানেও কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। ঢাকাকে তার সৌন্দর্যে ফিরিয়ে আনতে হলে বুড়িগঙ্গাকে অবশ্যই বাঁচাতে হবে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে আমাদের সন্তানদের খেলার উপযোগী জায়গা নেই। প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে যাতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা যায়-যাতে তারা খেলাধুলা করতে পারে। আজকে শিশুরা খেলাধুলা করতে করতে পারছে না বলে ভিন্ন দিকে ধাবিত হচ্ছে। সুতরাং খেলার সুষ্ঠু পরিবেশটা আনা দিরকার। এই ধরনের আরো অনেক কাজ রয়েছে।
দেশ প্রতিক্ষণ: ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে বিএনপি শঙ্কা প্রকাশ করছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
শেখ ফজলে নুর তাপস: আমি প্রত্যাশা করি, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। জনগণের যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি, তাতে অবশ্যই ভোটের দিন তারা অংশগ্রহণ করবে। ভোট সুষ্ঠু হবে। আমি মনে করি না যে, এখানে কোনো শঙ্কা আছে।
দেশ প্রতিক্ষণ: পুরান ঢাকাকে নিয়ে কোনো বিশেষ পরিকল্পনা?
শেখ ফজলে নূর তাপস: পুরান ঢাকার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা হবে। ঘিঞ্জি রাস্তা কিন্তু বিদেশেও আছে। সেখানে সবরকম যানবাহন চলে না। সুতরাং কোন রাস্তায় কোন যানবাহন চলবে সেগুলোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হবে। সেই অনুযায়ী সেই রাস্তাগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে, সংষ্কার করতে হবে। সেই অনুযায়ী যান চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। তা যদি করা যায়, তাহলে দেখবেন স্বমহিমায় একটি সৌন্দর্য প্রস্ফূটিত হবে। একসময় পুরান ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির খুব প্রচলন ছিল। এখনো আমরা কিছু ঘোড়ার গাড়ি দেখি।
এই গাড়িও যাতে সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে ঐতিহ্যবাহী ঢাকায়, সেটিও কিন্তু পরিকল্পনায় আনতে হবে। দেখুন, বাইরের দেশগুলোতে দেখি রাস্তার পাশেই পাম্পের ব্যবস্থা থাকে। যেকোনো অগ্নিনির্বাপনের জন্য গাড়িগুলোর যাতে পানির ব্যবস্থা করা যায়। এগুলো করতে হবে। সেই বিষয়টিও আমার পরিকল্পনায় আছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে নিয়েই আমার চিন্তা-চেতনা, কর্ম থাকবে। এর উন্নয়নেই আমি নিবেদিত হতে চাই।
দেশ প্রতিক্ষণ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
শেখ ফজলে নূর তাপস: আপনাকেও ধন্যবাদ।