আবদুর রহমান ও এফ জাহান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা গণনার সূত্র, বন্ডে বিনিয়োগ পুঁজিবাজারের বিনিয়োগসীমার বাইরে রাখাসহ সব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হলেও কেউ কোনো কথা বলেননি। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কী ধরনের সিদ্ধান্ত এসেছে তা নিয়ে চমক আসছে বলে বৈঠকের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় শুরু হওয়া এই বৈঠক চলে প্রায় আড়াই ঘণ্টাজুড়ে।



বৈঠক শেষে অতিরিক্ত সচিব মফিজ উদ্দীন আহমেদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানের কাছে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চান। এ সময় তিনি বলেন, বৈঠকের বিষয়ে নাহিদ ভাই (আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. নাহিদ হোসেন) কথা বলবেন। এরপর সাংবাদিকরা যুগ্ম সচিব নাহিদ হোসেন এবং অতিরিক্ত সচিব মফিজ উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কথা বলতে চাননি।

তবে দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের পক্ষ থেকে যুগ্ম সচিব নাহিদ হোসেন এবং বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। অবশ্য বৈঠকে কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলেননি।

তবে পুঁজিবাজার নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের পর সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা না এলেও বৈঠকে অংশ নেয়া একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা গণনা নিয়ে যে মতভেদ আছে, তা নিরসন এখন বিএসইসি বা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে নেই। বিষয়টি এখন সরকারের হাতে। গত ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে বৈঠকের এক সপ্তাহ পর প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় বৈঠকটির আয়োজন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ছাড়াও যোগ দেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবির প্রতিনিধি।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসির কেউ কথা বলেননি। বৈঠকের সভাপতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং শেয়ারবাজার কার্যক্রম সমন্বয় ও তদারকি কমিটির আহ্বায়ক মফিজ উদ্দীন আহমেদ জানিয়েছেন, তারা যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছেন, সেটি চূড়ান্ত আকার নিতে আরও একটি বৈঠক লাগবে। চলতি ডিসেম্বরে বা আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই হবে সেই বৈঠক।

এই বৈঠককে ঘিরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দুটি বিষয়ে প্রত্যাশা ছিল। একটি হলো পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা বা এক্সপোজার লিমিট ক্রয়মূল্যে নাকি বাজার মূল্যে বিবেচনা হবে, বন্ডে বিনিয়োগ এই সীমায় থাকবে নাকি বাইরে থাকবে। তবে বৈঠক শেষে এসব বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দেননি বৈঠকের সভাপতি। তিনি বলেন, ‘এগুলো খুবই সেনসিটিভ ইস্যু। এ ব্যাপারে এখনই কোনো কথা বলতে চাইছি না। এর জন্য আপনাদেরকে পরবর্তী বৈঠকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

বৈঠকে অংশ নেয়া অন্য কেউ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণকে বলেন, ‘এই দুটি বিষয়ে আলাপ হয়েছে। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের এগ্রি করা না করার বিষয় আর নেই। এটি এখন অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর বিষয়। তাদের দিক থেকে এসব বিষয়ে দিক নির্দেশনা আসবে। এটি করার জন্য আইন পরিবর্তনের দরকার পড়বে। সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে, এ জন্য কিছু সময় লাগবে।’

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মন্তব্য জানতে চাইলে সংস্থাটির সহকারী মুখপাত্র আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কোনো কথা বলবে না।’ ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ১৯৯৩ এ পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের বিষয়ে কিছু বিধি নিষেধ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানির আলোকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন জারি করে।

সেখানে বলা হয়, পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলো আদায়কৃত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম হিসেবে রক্ষিত স্থিতি, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও রিটেইন্ড আর্নিংসের ২৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে না। এ জন্য তিন বছর সময় দিয়ে কারও অতিরিক্ত বিনিয়োগ ২০১৬ সালের ২১ জুলাইর মধ্যে নামিয়ে আনতে বলা হয়। এই বিনিয়োগসীমা গণনার পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে মতভেদ আছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, শেয়ারের বাজারমূল্য বা ক্রয়মূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেটির মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় এই বিনিয়োগসীমা।

এর ফলে কোনো ব্যাংক তার বিনিয়োগসীমার মধ্যে শেয়ার কিনলেও তার দাম বেড়ে গেলে সীমা অতিক্রম করে গেলে তা বিক্রি করে দিতে হয়। এর ফলে পুঁজিবাজারে বিক্রয় চাপ আসে। এটিকে পুঁজিবাজার উন্নয়নের বাধা হিসেবে দেখছে বিএসইসি। গত ১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। তিনি এই হিসাব গণনার পদ্ধতি পাল্টে ক্রয়মূল্যে করতে আইন সংশোধনের অনুরোধ করেন সরকার প্রধানকে।

প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন, সেটি উল্লেখ না করলেও বিএসইসি চেয়ারম্যান বৈঠকের প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘সুপার আলোচনা হয়েছে।’ পরদিন রাজধানীতে এক আয়োজনে তিনি বলেন, পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকারের যে আন্তরিকতা সেটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশিত হবে।